May 15, 2026

মসির ধারায় অসির ধার (7)

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

সঞ্জীব মুখার্জী 

 

“If you go to work on your goals, your goals will go to work on you. If you go to work on your plan, your plan will go to work on you. Whatever good things we build, the same ends up building us.” – Jim Rohn

 

দিনটা ১৯৮৫ সালের ৭ই নভেম্বর, সময়টা ভোরবেলা না বলে একটু বেশি সকাল বেলা বললেই ঠিক বলা হয়।  শীতটা পড়বো পড়বো করছে।  সিউড়িতে ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জের ট্রেনটা মোটামুটি সাড়ে ছ’টাতেই ঢুকে যায়। সেদিনও রাইট টাইমেই ছিল ট্রেনটা।  ট্রেনটা ছাড়ে রামপুরহাট থেকে আর যায় হাওড়া অব্দিই।  আমার বাড়ি থেকে সিউড়ি স্টেশন এই পাঁচ কি ছয় কিলোমিটার হবে।  আমার ভাই আমাকে সাইকেলে করে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিলো। সঙ্গে একটা ব্যাগ আর তাতে দু-চারটে জামা কাপড় আর দরকারি কাগজপত্র।  স্টেশনে পৌঁছে হাওড়ার একটা টিকিট কেটে নিলাম।  ট্রেনটাতে ভিড় খুব একটা না হলেও খালিও খুব একটা থাকে না, তার কারণ সেই সময় সিউড়ি থেকে সকাল বেলা হাওড়াগামী একটাই ডাইরেক্ট ট্রেন চলতো আর ট্রেনটা পাণ্ডবেশ্বর, অন্ডাল, দুর্গাপুর, বর্ধমান ইত্যাদি স্টেশনগুলো ধরতো ফলে ঐসব এরিয়া তে চাকরি করা ডেলি প্যাসেন্জারদের ভিড় তো থাকতোই।  যাইহোক, প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনটা ঢোকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছি, তখন দেখি কেউ যেন আমার পিছন থেকে পিঠে আলতো করে ঠোকা দিলো, পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি বিপ্লব, বিপ্লব মজুমদার। আমরা দুজনই বীরভূম জিলা স্কুল থেকে একসাথে পাশ করি। তারপর আমি বিদ্যাসাগর কলেজে আর বিপ্লব জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামিনেশন ক্লিয়ার করে শিবপুর BE কলেজে।  বীরভূম জিলা স্কুল ছাড়ার পর মাঝে বেশ কয়েক বছর আমাদের দেখা সাক্ষাতই হয়নি। মোবাইলের যুগও ছিল না সেটা।  তো হঠাৎ করে বিপ্লবের সাথে ঐভাবে সিউড়ি স্টেশনে দেখা।  আমি বিপ্লবের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আর বিপ্লব ও আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।  নীরবতা আমিই ভঙ্গ করলাম, জিজ্ঞেস করলাম, বিপ্লব, তুই কোথায় যাচ্ছিস ?  বিপ্লবের উত্তর, কলকাতায় এক মাসির বিয়ে তাই সেখানে যাচ্ছি।  সঙ্গে বাবা, মা আর বোন।  বলাই বাহুল্য, ওরাও ময়ূরাক্ষী ধরেই যাবে। হটাৎ অনুভব করলাম প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত যাত্রীদের মধ্যে সারা পড়ে গেছে, কারণটাও স্পষ্ট, ট্রেন ঢুকছে। ট্রেনটা দাঁড়ানোর পর আমরা একই কম্পার্টমেন্টে উঠলাম।  উঠে উঠেই বিপ্লব ওর বাবা, মা আর বোন কে একটা সিটে বসিয়ে দিয়ে পাশের আর একটি সিটে আমার পাশে এসে বসলো।  খুব খুশি ছিল বিপ্লব, আমারও খুব ভালো লাগছিলো বিপ্লবকে পাশে পেয়ে।  ভাবছিলাম একা একা যাবো হাওড়া পর্যন্ত, তা দেখি ভগবান বিপ্লবকে জুটিয়ে দিলো। ট্রেনটা ছেড়ে দিলো। তারপর শুরু হলো আমাদের গল্প।  আর আমাদের গল্পের শুরুটাই হলো বিপ্লবের একটা প্রশ্ন দিয়ে, “কিরে সঞ্জীব, তুই কি বডি বিল্ডিং করছিস নাকি?” আমি বললাম, “কেন বলতো?”  বিপ্লবের উত্তর, “আসলে স্কুল জীবনে তোর শরীরটা বেশ রোগা আর ছিপছিপে ছিল, এমনকি এরজন্য তোকে আমরা ল্যাশপ্যাংলা বলেও মাঝে মধ্যে ডাকতাম আর তুই রেগে যেতিস, কিন্তু এখন দেখছি তোর শরীরের মাংসপেশীগুলো বেশ শক্ত পোক্ত আর শরীরের কাঠামোটা বেশ মজবুত আর সেই সঙ্গে তোর চেহারার মধ্যেও একটা ভারিক্কি ভাব, তাই জিজ্ঞেস করলাম আরকি।” “তা তুই যাচ্ছিস কোথায়?” এটা ছিল বিপ্লবের পরের প্রশ্ন।  আমি বললাম, “কলকাতা তে ফোর্ট উইলিয়াম-এ আর্মিতে জয়েন করার ফাইনাল রাউন্ডের পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি।” আর তারপর আমি বিপ্লবকে আদ্যোপান্ত সব কিছু বলতে শুরু করলাম। সবটা শোনার পর বিপ্লবের একটাই প্রতিক্রিয়া – ও! তবে তাই বল, এবার বুঝতে পারছি তোর শরীরে এইরকম পরিবর্তন আসলো কি করে।  তারপর একটা প্রশংসা সূচক মন্তব্য – সঞ্জীব, তবে তুই যে শরীরটা মিলিটারি তে জয়েন করার উপযুক্ত করে ফেলেছিস এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই – গ্রেট – দারুন ইত্যাদি। বিপ্লবের এই কথাগুলো যে কতখানি আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করছিলো সেটা আমি আপনাদের ভাষায় বোঝাতে পারবো না। তবে এটা সত্যি কথা যে আর্মিতে জয়েন করার জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে যে হারে আমি শরীর চর্চা আর কসরত করেছি তার ফলস্বরূপ আমার শরীরে ঐরকম যে বিকাশ ঘটেছিলো সেটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সংশয় ছিলনা। দৌড়, ঝাঁপ, ব্যায়াম, যোগাভ্যাস ইত্যাদির ফলে আমার শরীরে যে একটা আমূল পরিবর্তন এসে গিয়েছিল সেটা আমায় দেখলেই বোঝা যেত। আর একথাটা আমায় বেশ কয়েকজন বলেও ছিলো।  যাইহোক সবকিছু শুনে দেখে বিপ্লব কিন্তু খুবই রোমাঞ্ছিত এবং উচ্ছসিত, বিশেষ করে আমার আর্মি জয়েন করার প্রচেষ্টা আর উদ্দম দেখে।  বলল, “কিছু খাবি?”  আমি বললাম, “অবশ্যই।” কেননা খুব সক্কাল বেলা বাড়ি থেকে বেড়িয়েছি আর বেড়িয়েছি এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে তাই খিদে তো পেয়েই গিয়েছিলো। তাছাড়া ট্রেনে যাত্রা করার আর একটি বিশেষ যেটি আকর্ষণ ছিল সেটি হলো ঝালমুড়ি।  তখনকার দিনে ঝালমুড়ি ট্রেনে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না তাই, “ঝালমুড়ি হ’লে খেতে, হবে তোকে ট্রেনে যেতে।” যাইহোক, ঝালমুড়ি নেওয়া হলো সবারই জন্য, এদিকে আমরা দুজন আর ওদিকে বিপ্লবের বাকি পরিবারের সদস্যরা।”  তারপর চা হয়ে গেলো এক পশলা করে।  সবে পাশ আউট হয়েছে বিপ্লব BE কলেজ শিবপুর থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে আর কোনো এক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি তে জয়েনও করার মুখে।  গল্পের যেন আমাদের শেষ নেই।  স্কুল জীবনের দুষ্টুমির গল্প থেকে আরম্ভ করে, ফুটবল খেলা, ক্রিকেট খেলা, কিং খেলা, পিড্ডু খেলা, কবাডি খেলা, ক্লাসরুমে লুকোচুরি খেলা, কোন স্যার কিভাবে পড়াতেন, বকতেন, শাস্তি দিতেন, ইত্যাদি নিয়েই চলছিল আমাদের গল্পের আড্ডাটা।  মাঝখানে আর একবার ঝালমুড়ি আর এককাপ চা ও হয়ে গেলো। হটাৎ বিপ্লব বলে বসলো, সঞ্জীব তুইও আমাদের সঙ্গে চল আমার মামার বাড়ি, আমার মাসির বিয়েটাও এনজয় করা হবে আর ওখান থেকেই ফোর্ট উইলিয়াম এর পরীক্ষাটা দিতে তুই চলে যাবি, তোর কোনো অসুবিধা হবে না। পাশে বসে থাকা বিপ্লবের বাবা, মা আর বোন বিপ্লবের প্রস্তাবকে দৃঢভাবে সমর্থন জানালেন। আমি বিপ্লবকে বললাম, না রে আমি আমার বড়মাসীর বাড়িই যাবো, আর ওখান থেকেই পরীক্ষা দেব, আমায় আর প্লিজ জোর করিসনা। বিপ্লব ওই বিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে বললো, ঠিক আছে তাই কর তাহলে, তবে আর্মির পরীক্ষার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো আর পরীক্ষায় যেন সফল হতে পারিস সেই ব্যাপারে শুভকামনা থাকলো।  পেরিয়ে যাচ্ছিলো সব বড়ো, ছোট, মাঝারি স্টেশনগুলো। আর এই সবের মধ্যে দিয়ে দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশনে। তখন মোটামুটি সাড়ে এগারোটা বাজে। নামার ভিড়টা একটু কমলে ট্রেন থেকে আমরা সবাই নামলাম।  নামার পর সকলের থেকে বিদায় নিয়ে, বিপ্লবকে ওর নতুন কোম্পানিতে জয়েন করার শুভেচ্ছা জানিয়ে হাওড়া বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলাম যেখান থেকে আমি বড়মাসীর বাড়ি যাবার জন্য ৫২ নম্বর বাস ধরবো বলে।

বড়মাসীর বাড়ি যখন পৌছালাম তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। ব্যস, আর আমায় পায় কে।  মাসীর বাড়ি পৌঁছেতেই মাসীকে শর্টকাটে শুধু এইটুকুই বললাম, মাসী ফোর্ট উইলিয়ামে আমার ফাইনাল রাউন্ডের পরীক্ষা আছে ১০ই নভেম্বর আর্মিতে জয়েন করার জন্য।  শুনে মাসি তো খুব খুশি।  জল মিষ্টি খেতে দিয়ে মাসী বললো, সেই কোন সকালে বেরিয়েছিস, খিদে পেয়েছে তোর, আগে চান করে খেয়ে নে, তারপর খেয়ে দেয়ে স্বস্ত করে গল্প করবি। বিশদে সব গল্প শুনবো তোর মুখ থেকে।  মাসীকে মাথা নাড়িয়ে ঠিক আছে বললাম ঠিকই কিন্তু কার্যত তৎক্ষণাৎ চান করতে আমার বাথরুমে ঢোকা হলোনা, কেননা ততক্ষনে আমি জহর কে যে পেয়ে গেছি।  আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে জহর কে? জহর হল আমার ভাই, আমার বড়মাসীর বড় ছেলে।  জহর ছাড়া বড়মাসীর বাড়িতে আমার আর এক বোন আর এক ভাই যাদের নাম যথাক্রমে ববি এবং সৌরভ।  এবার আমার চান খাওয়া মাথায় উঠলো।  শুরু হয়ে গেলো আমাদের সব ভাই বোনেদের মধ্যে গল্পের আড্ডা।  আর সেই গল্পের আসরে রান্নার ফাঁকে ফাঁকে যোগ দিচ্ছিলেন বড়মাসীও।  বড় মেসোমশাই রেলে চাকরি করতেন।  আর আমি যখন মাসীর বাড়ি পৌছালাম তখন মেসোমশাই অলরেডি অফিসে।  তাই মেসোমশাই সেই সময় আমাদের গল্পের আসরের অংশীদার হতে পারেননি।  গল্প করতে করতে যখন অনেকক্ষণ হয়ে গেলো, তখন একরকম বকা ঝকা করেই এক এক করে চান করতে পাঠালেন।  তারপর আমরা চান করে খেয়ে দেয়ে আবার গল্পে মশগুল হলাম।

কথায় কথায় মাসী কে বললাম যে ১০ তারিখে পরীক্ষা দিতে যাবার আগে একবার জায়গাটা দেখে আসবো।  মাসী বললো আজকে তো সবে ৭ তারিখ, মাঝে তো আরো দুটো দিন আছে, তাই আজকে না গিয়ে কালকে অথবা পরশু গেলেই চলবে।  “ঠিক আছে মাসী”, মাথা নেড়ে সায় দিলাম। জহরকে নিয়ে জায়গাটা দেখে আসলাম ৮ তারিখ বিকাল বেলায়।  গল্প, খাওয়া দাওয়া আর আড্ডার মধ্যে দিয়েই এসে গেলো পরীক্ষার দিন।  ঠিক সকাল ৮ টাতেই পৌঁছতে হবে সেখানে।  বারোমাসী আর মেসোমশাই কে প্রণাম করে ১০ নভেম্বর সকাল সাড়ে ছটাতেই বেরিয়ে গেলাম সঙ্গে জহর কে নিয়ে।

ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে রেড রোড ক্যাম্পে যখন পৌঁছলাম তখন সাড়ে সাতটা।  গিয়ে দেখলাম সেখানে অলরেডি অনেক পরীক্ষার্থীর ভিড় যাদেরকে ফাইনাল রাউন্ডের পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়েছে।  তাদের মধ্যে কিছু চেনা পরীক্ষার্থীকেও পেলাম সেখানে যারা আমার মতো মালদা থেকে সিলেক্টেড হয়ে এসেছে।  আর সেখানে আরো অচেনা পরীক্ষার্থীও ছিল যারা অন্য জায়গা থেকে সিলেক্টেড হয়ে এসেছে।  যেমন আমার সাথে আমার ভাই জহর ছিল তেমনি অনেকের সাথেই কেউ না কেউ ছিল।  সব মিলিয়ে সেখানটা ভিড়ে বেশ জমজমাট। ফোর্ট উইলিয়াম তো আপনারা সবাই জানেন।  একটা বিরাট মিলিটারি বেস হলো ফোর্ট উইলিয়াম।  পরীক্ষাস্থলে ঢুকতে হয় একটা বড়ো গেট এর মধ্যে দিয়ে।  সেই মেন্ গেটের সামনে সেখানে বেশ কয়েকজন সেনাবাহিনীর প্রহরী অর্থাৎ সান্ত্রী দাঁড়িয়ে।  তাদের সামনে যেতেই তারা আমার কল লেটারটা দেখতে চাইলো আর সেটা তাদের দেখানোর পর আমায় গেটের ভিতর প্রবেশ করতে অনুমতি দিলো। জহর কে সেখানে যেতে অনুমতি দিলনা তারা।  বললো পরীক্ষার্থী ছাড়া সেখানে আর কারুর যাবার অনুমতি নেই।  জহর যে মেন্ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকুক সেটা আমি মোটেই চাইছিলাম না।  তাই  আর একবার চেষ্টা করে দেখলাম যদি আসতে দেয় জহরকে সেখানে, কিন্তু কোনো লাভ হলো না।  মেন্ গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো জহরকে।  মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু কোনো উপায় তো নেই।  মিলিটারির ব্যাপার। ওদের একটা কথাই একশোটা কথার সমান।  শুধু আমি কেন, আমি ছাড়া আরো অনেকে অনুরোধ করছিলো সান্ত্রীগুলোকে তাদের সঙ্গী বা সাথীদের ভিতরে আসতে দেওয়ার পারমিশন দেবার জন্য।  কিন্তু বৃথাই তাদের সে প্রয়াস। যাই হোক, জহর কে বলে মেন্ গেটের ভিতর ঢুকে গেলাম আমি।  ঢোকার সময় জহর আমায় বললো, খুব ভালো করে পরীক্ষা দিও বড়দা, কোনো চিন্তা করোনা, দেখো তোমার হয়ে যাবে।

মেন্ গেট অতিক্রম করে এবার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমি এবং অন্যান্য পরীক্ষার্থী দের নিয়ে যাওয়া হলো।  তারপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি বড় ফাঁকা মাঠে।  সেই মাঠে খড়ি দিয়ে দৌড়ের ট্র্যাক বানানো রয়েছে ঠিক যেমনটি স্কুলে স্পোর্টস এর জন্য করা থাকে।  এছাড়া আরো অন্যান্য পরীক্ষার সাজ সরঞ্জাম অর্থাৎ বিম, ব্যালান্স বার, ৯ ফুট লং জাম্প এর ডিচ, ইত্যাদি ও ছিল সেই মাঠে।  পরীক্ষার শুরুটা হলো ৪ কিলোমিটার দৌড়ের মাধ্যমে।  ঐগুলো দেখছি আর কার্তিকদার কথা মনে পড়ছে আমার যে নিজের দিন রাত এক করে আমাকে এই সব পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তৈরী করেছে।  এক এক করে সব পরীক্ষা হয়ে গেলো আমার।  আর সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছিলো আমাদের সকল পরীক্ষার্থীর স্কোর শিট।  সব পরীক্ষা সম্পন্ন হতে দুপুর হয়ে গেলো আর হয়ে গেলো মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতি।  তারপর আমাদের সকলকে বলা হলো যে আমরা আমাদের লাঞ্চ সেরে সেখান আবার বিকাল ৪ টা তে হাজির হই, তখন নাকি সেদিনের আমাদের শারীরিক পরীক্ষার পাশ ফেলের ফল ঘোষণা করা হবে।  আমি সেখান থেকে এক দৌড়ে মেন্ গেটের বাইরে যেখানে আমার ভাই জহর অপেক্ষা করছিলো।  সেখানে পৌঁছে জহরের সাথে দেখা হওয়া মাত্র জহরের একটাই প্রশ্ন, “পরীক্ষা কেমন হলো বড়দা।” আমি বললাম, “পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে রে, বিকাল ৪ টা তে রেজাল্ট, দেখা যাক কি হয়।”  জহর বললো, “বড়দা, তুমি পাশ করবেই।”  এবার আমি জহর কে বললাম, “অনেকক্ষন ধরে অপেক্ষা করছিস তুই, খুব খিদে পেয়েছে নারে তোর?” “চল কিছু খেয়ে আসি, আমার ও খুব খিদে পেয়েছে, অনেক শারীরিক মেহনত হয়েছে পরীক্ষা দিতে।”

কাছেপিঠেই রাস্তার ধারে কোনো স্ট্রিট ফুডের দোকানে গিয়ে আমরা কিছু খেয়ে নিলাম। তারপর ফিরে এলাম আবার ওই পরীক্ষার স্থলে।  মেন্ গেটের সামনে আমার মতো আরো সবাই অধীর অপেক্ষায় রয়েছে যে কতক্ষনে ফল ঘোষণা হবে।  যাই হোক, ঠিক চারটের সময় দেখি দূর থেকে কয়েকজন উর্দি পড়া মিলিটারির লোক এসে মেন্ গেটের ভিতর দিকটায় দাঁড়ালো তারপর তাদের মধ্যে একজন আমাদের সামনে এসে সমস্ত পরীক্ষার্থীদের মেন্ গেটের ভিতর যেতে বললো।  কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম তাদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ মিলিটারি অফিসার, তিনি নাকি কর্নেল সাহেব, তাঁর বাকি সঙ্গীরা সব নিম্নপদস্থ অফিসার।  কর্নেল সাহেব আমাদের শান্ত হয়ে বসতে বললেন তারপর একটা ফাইল খুলে এক এক করে পরীক্ষার্থীদের নাম এবং তার সঙ্গে বাবার নাম ধরে ডাকতে লাগলেন আর নাম ডাকার পর বলছেন যে সেই পরীক্ষার্থী শারীরিক পরীক্ষায় পাশ করেছে না ফেল করেছে। আর যারা পাশ করেছে তাদের কে একদিকে বসতে বললেন আর যারা ফেল করেছে তাদের কে আর দিকে বসতে বললেন। আমার তখন বুক দুরু দুরু করতে শুরু করে দিয়েছে। ভগবান কে তখন একমনে ডাকছি। হটাৎ শুনলাম, কর্নেল সাহেবের মুখ থেকে – সঞ্জীব কুমার মুখার্জী, বাবার নাম নীরদ বরণ মুখার্জী – পাশ। এটা শোনার পর আমার স্বগতোক্তি – আহঃ।  তারপর বসে পড়লাম গিয়ে যে দিকটায় সব পাশ করা পরীক্ষার্থীরা বসে আছে।  সবার নাম ঘোষণা করার পর, কর্নেল সাহেব যারা ফেল করেছিল তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন তারা বাড়ি গিয়ে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়, তাদের আর একটা চান্স দেওয়া হবে এবং তাদের বাড়ির ঠিকানায় আবার নতুন করে দিন এবং সময় জানিয়ে তাদের আবার ফোর্ট উইলিয়ামে আসার জন্য কল লেটার পাঠানো হবে।  তারা যেন সেখানে অপেক্ষা না করে তক্ষুনি বাড়ি চলে যায় সেটাও বলে দেয়।  তাদের পাঠিয়ে দিয়ে তারপর আমাদের সামনে এসে একটি চেয়ার নিয়ে বসলেন তারপর আর একটি ফাইল খুললেন।  পাশ করা পরীক্ষার্থীদেরকে এক এক করে নাম ধরে ডাকেন আর ফাইল থেকে একটি কাগজ বের করে ধরিয়ে দেন।  আমাকেও একটা কাগজ দেওয়া হলো, কাগজটি হাতে নিয়ে পড়ে বুঝতে পারলাম সেটা এডমিট কার্ড, তাতে লেখা ছিল তার পরদিন অর্থাৎ ১১ নভেম্বর ১৯৮৫ কলকাতা গোখেল রোড এ অবস্থিত আর্মি রিত্রুটমেন্ট হেডকোয়ার্টার এ আমাদের লিখিত পরীক্ষা হবে সকাল দশটায় এবং সেখানে যেন আমরা হাজির থাকি সমস্ত লেখন সামগ্রী নিয়ে।

কাগজটা হাতে পেয়ে যে কি আনন্দ হচ্ছিলো আমার তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না, কিন্তু তখনই আমার আনন্দে ভেসে যাওয়ার সময় হয়নি, আসলটা তো কালকে এই ভেবে নিজেকে সংযত করে আমি অপেক্ষমান জহর-এর কাছে ফিরে এলাম আর জহরকে সুখবর টা দিলাম।  শুনে জহর-এর শুধু একটাই প্রতিক্রিয়া ছিল, “আমি কি বলেছিলাম তোমাকে বড়দা, দেখলে তো হলো কিনা?” আমি বললাম, “ভাইটি আসলটা যে এখনো বাকি।” জহর বললো, “বড়দা, এত দূর যখন এসে গেছো তখন দেখবে কালকেরটাও ঠিক হয়ে যাবে।”  আমরা দুজনে গল্প করতে করতে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে।  বাড়ি ফিরে মাসীকে সুখবর টা দিলাম আর কি কি হলো সব কিছু বললাম।  মাসী বললো তোদের সারা দিন ঠিক করে খাওয়া দাওয়া কিছুই হয়নি, এই বলে লুচি, ঘুগনি আর মিষ্টি দিয়ে জলখাবার দিলো। জলখাবার খেয়ে আমি একটু কম্পেটিশন-এর বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। মাসী বললো কালকে আবার যেতে হবে তোদের সকাল বেলায়, তাই বেশি রাত পর্যন্ত গল্প করিসনা তোরা, আমি খেতে দিচ্ছি, তোরা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পর।  টেনশনে তো ঘুমই এলোনা সারা রাত, এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে দিলাম রাতটা। সক্কাল বেলায় একটু হালকা জলখাবার খেয়ে আবার তৈরি হয়ে মাসী আর মেসোমশাই কে প্রণাম করে বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে জহর।  যথা সময়ে পরীক্ষার জায়গায় পৌঁছলাম।  আগের দিনের মতো সেদিন ও জহরকে মেন্ গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো।  সত্যিই, আজও আমি নিঃসংকোচে স্বীকার করি আমার জন্য জহরের সেই আত্মত্যাগ, আমার সাথে সাথে জহরকেও কি কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।  লিখিত পরীক্ষা শুরু হলো ঠিক ১০টাতে। শুরুতেই ম্যাথেমেটিক্স, তারপর ইংলিশ আর শেষকালে GK & CA বেসড আপটিটুড টেস্ট। সব পেপার-ই ভালো হয়েছিল আমার, এককথায় আশানুরূপ বলা চলে।  পরীক্ষা যখন শেষ হলো তখন বাজে ঠিক দুপুর দুটো।  পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমাদের সকলকে বলা হলো যে আমাদের দুটি করে সেলফ এড্রেসড এনভেলপ এবং তাতে ডাক টিকিট সাঁটিয়ে তাদের কাছে জমা করিয়ে তবে যেন আমরা সেখান থেকে যাই।  এবার আমি পড়লাম ফ্যাসাদে।  কিন্তু সঙ্গে ছিল আমার ভাই জহর, যদিও সে মেন্ গেটের বাইরেই অপেক্ষা করছিলো।  তাড়াতাড়ি গেটের সামনে এসে ভাইয়ের শরণাপন্ন হলাম।  দৌড়ে দৌড়ে কোথায় কোথায় গিয়ে ডাক টিকিট এনভেলপ সব নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হলো জহর।  মেন্ গেটের গরাদের ফাঁক দিয়েই আমাকে ধরিয়ে দিলো সেগুলো।  হাতে পেয়েই তাতে আমার নাম, বাবার নাম, বাড়ির ঠিকানা এইসব লিখে তার উপর ডাক টিকিট চিটিয়ে সেগুলো জমা দিয়ে দিলাম। তারা বললো যে যারা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করবে তাদের বাড়িতে জয়েনিং লেটার অটোমেটিক্যালি পৌঁছে যাবে। তৎক্ষণাৎ মেন্ গেটের বাইরে বেরিয়ে আসলাম।  খিদেতে পেট চুঁ চুঁ করছে তখন।  জহরের সাথে দেখা হতেই জহরকে বললাম, “আমার নাহয় পরীক্ষা ছিল কিন্তু বিনা কারণে তোর কি শাস্তি বলতো?”  জহরের উত্তরটা ছিল, “কি যে বলো বড়দা ? তোমার পরীক্ষা কেমন হলো সেটা আগে বলো।”  আমি বললাম, “খুবই ভালো হয়েছে রে, এবার চল দুজনে কিছু খাই, তারপর বাড়ি।” এই বলে আমরা কিছু খেয়ে সেখান থেকে বাড়ির অভিমুখে রওনা দিলাম।  বাড়ি পৌঁছে মাসীকে পরীক্ষার ব্যাপারে সব কিছু বললাম।  রাত্রিতে মাসী অনেক কিছু রান্না করেছিল। খাওয়া দাওয়া করে অনেকক্ষণ গল্প করলাম জহরে আমাতে। নিজেকে খুব চাপহীন আর হালকা লাগছিলো পরীক্ষা চুকে যাওয়ার পর।  তারপরদিন বাড়ি ফেরার পালা। মাসীর বাড়িতে আরো কয়েকটা দিন থেকে গেলেই পারতাম কিন্তু বাড়িতে যে বিয়ে।  তাই পরদিন সকালে মাসীর বাড়ি থেকে হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে মাসী আর মেসোমশাই কে প্রণাম করে সিউড়ি ফিরে যাবো বলে বেরিয়ে পড়লাম।  বেরোবার সময় মাসী বললো, “সুখবরটা দিস যেন।” আমি বললাম, “অবশ্যই মাসী, আশীর্বাদ করো সুখবরটাই যেন দিতে পারি তোমাকে।” এই বলে ট্রেন ধরার জন্য হাওড়া স্টেশন পৌঁছলাম। স্টেশন অব্দি ছাড়তে এসেছিলো আমার ভাই জহর।  মনটা খুব খারাপ করছিলো আমাদের দুজনের।  ইচ্ছে করছিলো না জহরকে ছেড়ে যেতে।  কিন্তু উপায় তো নেই।  শুধু এইটুকু বললাম জহরকে, “ভাইটি মন খারাপ করিসনা, হয়তো খুব তাড়াতাড়িই দেখা হচ্ছে আমাদের।” ট্রেনে উঠে জানালার পাশটাতে বসলাম। জহর ও জানালার পাশটাতে প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে।  আমাদের দুজনের মুখ তখন কাঁদো কাঁদো।  যথা সময়ে ট্রেন ছেড়ে দিলো, ধীরে ধীরে চলতে লাগলো ট্রেন। আমি জানালার ভিতর থেকে জহরকে যতটা পারছিলাম দেখতে চেষ্টা করছিলাম। ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো আর সেই সঙ্গে প্লাটফর্মে দন্ডায়মান জহরও দৃষ্টির বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। আর দেখতে দেখতে একসময় অদৃশ্য হয়ে গেলো জহর।  ট্রেনটা তখন একটু একটু করে স্পীড নিতে শুরু করেছে।

                                                                                           ক্রমশঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *